সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬

রেলে ফারুক গং সিন্ডিকেট’ শতকোটি টাকার রাষ্ট্রীয় সম্পত্তি আত্মসাৎ, ফারুক গংদের বিচারের দাবিতে দুদকে আবেদন

নিজস্ব প্রতিনিধিঃ

প্রকাশিত: সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬

বাংলাদেশ রেলওয়ের ঢাকা বিভাগের ভূ-সম্পত্তি দপ্তরকে জিম্মি করে গড়ে উঠেছে ‘বরিশাল সিন্ডিকেট’ নামের এক সুসংগঠিত অপরাধী চক্র। জমি ব্যবস্থাপনা, অবৈধ লিজ প্রদান এবং ভুয়া লাইসেন্স বাণিজ্যকে পুঁজি করে সরকারের শতশত কোটি টাকার রাজস্ব ক্ষতি করছে এই চক্রটি। প্রাপ্ত অভিযোগে জানা গেছে, এই সিন্ডিকেটের মূল পরিকল্পনাকারী ও অন্যতম হোতা হলেন ঢাকা ভূ-সম্পত্তি দপ্তরের আমিন মোঃ ফারুক হোসেন। দীর্ঘ দিন ধরে নিজের পদের অপব্যবহার, প্রশাসনিক প্রভাব ও জাল নথি তৈরির মাধ্যমে তিনি ও তার সহযোগীরা নামে-বেনামে অঢেল সম্পদের মালিক বনে গেছেন।

সম্প্রতি এই চক্রের বিরুদ্ধে অনুসন্ধানমূলক আইনি বিচার চেয়ে দুর্নীতি, জালিয়াতি এবং রাষ্ট্রীয় সম্পত্তি আত্মসাতের সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণসহ দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) একটি অভিযোগ জমা দেওয়া হয়েছে। আবেদনে ফারুক হোসেনসহ সিন্ডিকেটের মূল আসামিদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের, বিদেশ গমনে নিষেধাজ্ঞা এবং দ্রুত গ্রেফতারের দাবি জানানো হয়েছে। এর আগে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের কাছে একাধিকবার অভিযোগ করা হলেও কোনো দৃশ্যমান প্রতিকার পাওয়া যায়নি। এমনকি ফারুক হোসেনের বিরুদ্ধে উচ্চপর্যায়ের তদন্ত শেষে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হলেও এক রহস্যজনক কারণে তা ফাইলবন্দি হয়ে থাকে। ফলে ন্যায়বিচার ও রাষ্ট্রীয় সম্পদ রক্ষায় এবার সরাসরি দুদকের দ্বারস্থ হয়েছেন অভিযোগকারী।

ব্যাকডেটেড ফাইল ও ভুয়া লাইসেন্স: রাজস্ব ক্ষতি অন্তত ৫ কোটি টাকা

অভিযোগে বলা হয়েছে, সিন্ডিকেটের মূল হোতা মোঃ ফারুক হোসেন (আইডি/আমিন) রেলওয়ের ঢাকা বিভাগের অধীনস্থ নরসিংদী ও মাইজগাঁওসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ রেলওয়ে সেকশনে জালিয়াতির এক বিশাল জাল বুনেছেন। তিনি সম্পূর্ণ অবৈধ উপায়ে ফাইলের পেছনে ব্যাকডেট (পূর্বের তারিখ) বসিয়ে বিপুল সংখ্যক বাণিজ্যিক লাইসেন্স ইস্যু করেছেন। সরকারি নিয়ম অনুযায়ী, প্রতি বর্গফুট বাণিজ্যিক লাইসেন্সের নির্ধারিত ফি ১৫০/- (একশত পঞ্চাশ) টাকা। কিন্তু ফারুক হোসেন সরকারি এই নির্ধারিত রেট গোপন করে নথিপত্রে মাত্র ৫০/- (পঞ্চাশ) টাকা রেট দেখিয়ে ফাইল অনুমোদন করিয়ে নেন। ক্ষেত্রবিশেষে প্রতি বর্গফুটে অবশিষ্ট ১০০ টাকা গোপনে গ্রাহকদের কাছ থেকে উৎকোচ হিসেবে গ্রহণ করে সিন্ডিকেটের সদস্যরা নিজেদের মধ্যে ভাগবাটোয়ারা করে নেন। প্রাথমিক হিসাব মতে, তাদের এই অপকর্মের কারণে শুধুমাত্র এই খাত থেকেই সরকারের প্রত্যক্ষ রাজস্ব ক্ষতি হয়েছে প্রায় ৫ (পাঁচ) কোটি টাকা।

শমশেরনগরে রেলের জমি বিক্রি ও জাল এনওসি (ঘঙঈ) জালিয়াতি

এই সিন্ডিকেটের অপরাধের পরিধি কেবল লাইসেন্স জালিয়াতিতেই সীমাবদ্ধ নয়। মৌলভীবাজারের শমশেরনগর সেকশনে রেলওয়ের কোটি কোটি টাকা মূল্যের মূল্যবান সরকারি জমি অবৈধভাবে বিক্রি ও লিজ হস্তান্তরের মাধ্যমে মোটা অঙ্কের অর্থ হাতিয়ে নিয়েছে এই চক্র। এই অবৈধ জমি বিক্রির পেছনে অন্যতম অভিযুক্ত মোহাম্মদ শাহাদাত হোসেনের সরাসরি সম্পৃক্ততা ও আর্থিক লেনদেনের অকাট্য প্রমাণ মিলেছে। এছাড়া, সরকারি চাকরি বিধিমালা সম্পূর্ণ লঙ্ঘন করে কোনো প্রকার প্রশাসনিক অনুমোদন বা অনাপত্তি পত্র ছাড়াই ফারুক হোসেন অবৈধভাবে বিদেশে অবস্থান ও ওমরাহ পালন করেন। পরবর্তীতে দেশে ফিরে নিজের অপরাধ ঢাকতে অনৈতিক প্রশাসনিক প্রভাব ও অর্থের বিনিময়ে ব্যাকডেটে ভুয়া ও জাল এনওসি তৈরি করান, যা দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী একটি গুরুতর ও শাস্তিযোগ্য ফৌজদারি অপরাধ।

কানুনগো ইকবাল ও সাবেক কর্মকর্তা নাসিরের ‘নেপথ্য সিন্ডিকেট’

মাঠপর্যায়ে এই বিশাল জালিয়াতির নেটওয়ার্ক সচল রাখতে ফারুক হোসেনের প্রধান সহযোগী হিসেবে কাজ করছেন ফিল্ড কানুনগো মোঃ ইকবাল মাহমুদ। ইকবালের মূল কাজই ছিল ফারুকের নির্দেশনায় ফাইলের পেছনে পূর্বের তারিখ বসিয়ে ভুয়া কৃষি ও বাণিজ্যিক লাইসেন্সের ফাইল প্রস্তুত করা, সরেজমিনে তদন্ত ছাড়াই লিজের পক্ষে গোপন ও ভুয়া রিপোর্ট তৈরি করা এবং বিভিন্ন গ্রাহকের কাছ থেকে ঘুষের টাকা তোলা। এই সিন্ডিকেটের অন্যতম আশীবার্দপুষ্ট ও পৃষ্ঠপোষক হিসেবে নাম এসেছে সাবেক উপ-সচিব ও বিভাগীয় ভূ-সম্পত্তি কর্মকর্তা নাসির উদ্দিন মাহমুদের। তার মেয়াদকালে নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে, ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে একের পর এক বিতর্কিত ও অবৈধ লাইসেন্স অনুমোদন দেওয়া হয়েছে, নাসির উদ্দিনের এই পৃষ্ঠোপষকতা সিন্ডিকেটের সদস্যদের অপরাধের শিকড়কে আরও গভীরে নিয়ে গেছে।

আইনের যেসব ধারায় কঠোর শাস্তির বিধান

আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকারি কর্মচারী হয়েও এই চক্রের কর্মকাণ্ড সরাসরি ‘দণ্ডবিধি ১৮৬০’ এবং ‘দুর্নীতি দমন কমিশন আইন ২০০৪’-এর স্পষ্ট লঙ্ঘন। অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে যেসব ধারায় আইনি ব্যবস্থার সুযোগ রয়েছে, দণ্ডবিধি ৪০৯ ধারা মতে সরকারি সম্পত্তি নিয়ে অপরাধমূলক বিশ্বাসভঙ্গ ও আত্মসাৎ, দণ্ডবিধি ৪২০ ধারা: জালিয়াতি ও প্রতারণার মাধ্যমে অর্থ আত্মসাৎ ও দণ্ডবিধি ৪৬৮, ৪৬৯ ও ৪৭১ ধারা: জালিয়াতির উদ্দেশ্যে জাল দলিল প্রস্তুত ও তা খাঁটি হিসেবে ব্যবহার। দুদক আইন, ২০০৪-এর ২৬(২) ও ২৭(১) ধারায় জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন ও সম্পদের হিসাব গোপন করার মতো অপরাধ। উল্লেখিত অপরাধের কারণে এই চক্রের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে পারে দূর্নীতি দমন কমিশন।

দুদকের জরুরি হস্তক্ষেপ ও গ্রেফতারের দাবি

রেলওয়ের সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারী ও সচেতন মহলের দাবি, রাষ্ট্রীয় এই মূল্যবান সম্পদ ও কোটি কোটি টাকার রাজস্ব রক্ষার্থে অবিলম্বে এই ‘বরিশাল সিন্ডিকেট’-এর বিরুদ্ধে দুদকের একটি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন টিমের মাধ্যমে নিরপেক্ষ অনুসন্ধান চালানো প্রয়োজন। ফারুক হোসেনসহ চক্রের মূল সদস্যদের অনতিবিলম্বে গ্রেফতার করে জিজ্ঞাসাবাদ করলে রেলওয়ের ভূ-সম্পত্তি খাতের শত শত কোটি টাকার জালিয়াতির আসল থলের বিড়াল বেরিয়ে আসবে। রাঘববোয়ালদের মুখোশ উন্মোচন ও রাষ্ট্রীয় সম্পদ বাঁচাতে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) দ্রুত ও কঠোর দৃশ্যমান পদক্ষেপই এখন সময়ের দাবি।

Share with friend