‘সোনার বাংলাদেশ এগিয়ে যাবে তরুণদের নেতৃত্বে’

নেতৃত্ব আল্লাহ প্রদত্ত একটি বিশেষ গুণ। হাতেগোনা কিছু মানুষের মধ্যে এই ক্ষমতাটি থাকে। এজন্য প্রাচীনকালে মনে করা হতো, নেতা যারা হতে পারে তারা জন্ম থেকেই এই গুণটি অর্জন করে থাকে। তবে নেতৃত্বের যোগ্যতাকে পরিপূর্ণতায় পৌঁছানোর লক্ষ্যে অনুশীলনও করতে হয়।আমরা সুস্পষ্ট দেখতে পাই জনসংখ্যার বিবেচনায় আমাদের দেশে বৃহৎ অংশ তরুণ।

সরকারি তথ্য মতে, দেশে প্রায় ৪ কোটি ২০ লক্ষ তরুণ রয়েছে। ২০৩০ সালের মধ্যে টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন ও ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত দেশ হতে গেলে এই বিশাল তরুণ প্রজন্মকে উন্নয়ন কর্মে নিয়োজিত করা জরুরি।

তরুণরা যাতে তাদের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করতে পারে সে পরিবেশ ও সুযোগ-সুবিধা থাকতে হবে। এটা সত্য যে, বিগত কয়েক বছরে আর্থ-সামাজিকভাবে দেশের অনেক অগ্রগতি হয়েছে।

তরুণদের কর্মসংস্থানে অন্তর্ভূক্ত করার মধ্য দিয়ে টেকসই উন্নয়নের পথে এগিয়ে যেতে হবে। অবশ্য এ পথ পাড়ি দিতে অনেক চ্যালেঞ্জও রয়েছে। এই চ্যালেঞ্জগুলো দৃঢ়ভাবে মোকাবেলা করতে হবে।

এই বিষয়ে নীতিমালা রয়েছে বর্তমান সরকারের। তবে বাস্তবায়নে আরও জোর দিতে হবে। টেকসই উন্নয়ন হতে হবে মানবকেন্দ্রিক। আর এর জন্য একজন মানুষকে বিবেচনা করতে হবে তার মাতৃগর্ভে থাকাকালীন সময় থেকে মৃত্যু পর্যন্ত।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বর্তমান যুগের আলোকে একজন মানুষের ১০টি জরুরি দক্ষতার কথা বলেছে।

একজন শিশুর জন্য পূর্ণাঙ্গ মানুষ হয়ে ওঠার পথে এই ১০টি দক্ষতা অর্জন করা অত্যাবশ্যকীয়। তাহলে সে শিশুটি একজন পূর্ণাঙ্গ মানুষ হয়ে নিজের এবং রাষ্ট্রের কাজে লাগতে পারে। সেগুলো হলো - 

১. Problem Solving (সমস্যা সমাধানে দক্ষতা)

২. Decision Making (সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা)

৩. Creative Thinking (সৃজনশীল চিন্তা)     

৪. Critical Thinking (সমালোচনামূলক চিন্তা) 

৫. Self Awarness (আত্ম সচেতনতাবোধ)   

৬. Empathy (সহমর্মিতাবোধ)                       

৭. Interpersonal Relationship (সামাজিক সম্পর্ক)     

৮. Good Communication (দক্ষ যোগাযোগ)

৯. Management Of Stres (দুশ্চিন্তা ব্যবস্থাপনা) 

১০. Management Of Emotion (আবেগ নিয়ন্ত্রণ)

অর্থাৎ, একজন ব্যক্তিকে একই সঙ্গে যৌক্তিক ও বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণের ক্ষমতার পাশাপাশি সৃজনশীল ক্ষমতারও অধিকারী হতে হবে।

তাকে নানা ধরনের পরিস্থিতি বুঝে আবেগকে নিয়ন্ত্রণ করে দক্ষতার সঙ্গে অপরাপর মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করতে হবে। এই দক্ষতাগুলোই কিন্তু একজন নেতার ভেতর থাকা প্রয়োজন। প্রকৃতপক্ষে একজন ব্যক্তিকে নেতা হওয়ার জন্য উক্ত গুণাবলির সবগুলোই থাকতে হবে। সুতরাং বর্তমান তরুণ নেতার জন্য কী কী প্রয়োজন সেটা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশিত দক্ষতা থেকেই উপলব্ধি করা যায়।

তরুণ নেতা অর্থ এই নয় যে, সে রাজনৈতিক নেতা হয়ে উঠবে, বরং সে বিভিন্নগুণ বৈশিষ্ট্যের সমন্বয়ে এমন একজন মানুষ হয়ে উঠবে, যে পরিবার-সমাজ-কর্মক্ষেত্রসহ রাষ্ট্রের  সর্বত্রই যোগ্যতার প্রতিফলন ঘটিয়ে নিজেকে এগিয়ে রাখবে। নিজ নিজ অবস্থানে ও কর্মক্ষেত্রে নেতৃত্ব দেবে। এদের মধ্য থেকেই একটি শ্রেণি উঠে আসবে যারা দেশ পরিচালনায় নেতৃত্ব প্রদান করবে। তাই পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সমাজ এদের সমন্বিত প্রচেষ্টা, সচেতনতা ও ভূমিকা পালনের মধ্য দিয়ে নতুন প্রজন্মের নেতা গড়ে তোলা সম্ভব। পরিবারের পর বিভিন্ন স্তরের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সমাজ, খেলার মাঠ, সামাজিকীকরণ এসব অনুসঙ্গের যথাযথ অনুশীলনের মাধ্যমে আজকের নতুন প্রজন্ম একদিন রাষ্ট্র পরিচালনার নেতৃত্ব দিতে সক্ষম হবে।

তরুণ নেতা তৈরি করার প্রক্রিয়া পরিবার থেকেই শুরু করতে হয়। নেতৃত্বের যে গুণাবলি রয়েছে তার চর্চা বেশি হওয়ার সুযোগ থাকে যৌথ পরিবারে। পরিবারে অনেক সদস্যের মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতা, সহানুভূতি, সহমর্মিতা ইত্যাদির চর্চা হয়। আবার যৌথ পরিবার বিভিন্ন প্রজন্মের প্রতিনিধিত্ব করে। বর্তমান বাস্তবতায় যৌথ পরিবারের অস্তিত্ব বিলুপ্ত প্রায়। তা সত্ত্বেও আলাদা পরিবারে বসবাস করেও সন্তানের স্বার্থেই পারিবারিক বন্ধন দৃঢ় রাখার ব্যাপারে পরিবারগুলোকে সচেষ্ট হতে হবে।

তরুণরাই আমাদের জাতিসত্তার আগামীর সম্ভাবনা। তাদেরকে আমরা প্রচণ্ড ভালোবাসি। আমরা যদি প্রতিটি স্তরে তাদেরকে নিরাপদ ভাবে গড়ে তুলি, বাস্তবতার আলোকে প্রযুক্তিগত শিক্ষা ও নৈতিক শিক্ষার সমন্বয়ে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারি তাহলে তারাই হবে আমাদের অমূল্য সম্পদ। তাদেরকে বিশ্বজনীন ভাতৃত্বের শিক্ষা দিতে হবে। চিন্তা জগতে মূল্যবোধ তৈরিতে ছোট বেলা থেকেই নৈতিকতার ভাবধারায় গড়ে তুলতে হবে। তাহলে আমরা একটি দুর্নীতি পরায়ন জাতি হিসেবে ভবিষ্যতে আর আমাদেরকে গ্লানি টানতে হবে না। তরুণদেরকে সঠিক পৃষ্ঠপোষকতা করতে পারলে তারাই হবে আমাদের সোনার বাংলার কাণ্ডারী।